আসানসোল, ২৮ আগস্ট ২০২৬: পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলার জলঙ্গি বিধানসভা এলাকার বাসিন্দা গুলাম মুস্তাফা পায়ে হেঁটে হজযাত্রার উদ্দেশ্যে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিচ্ছেন। সেই যাত্রাপথে আসানসোলের হাইওয়ে বাইপাস এলাকা দিয়ে যাওয়ার সময় তাঁর সঙ্গে কথিত মারধর ও দুর্ব্যবহারের অভিযোগ সামনে এসেছে। ২৬ আগস্টের এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে এলাকায় চাঞ্চল্য ছড়ায়। পরে পুলিশ ঘটনায় অভিযুক্ত এক যুবককে গ্রেফতার করেছে বলে জানা গিয়েছে।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ২৬ আগস্ট গুলাম মুস্তাফা আসানসোলের হাইওয়ে বাইপাস সংলগ্ন এলাকা দিয়ে যাচ্ছিলেন। সেই সময় বিঘ্নেশ্বরা মার্বেলসের কাছে এক যুবকের সঙ্গে তাঁর বচসা হয় বলে অভিযোগ। এরপর ওই যুবক তাঁর সঙ্গে মারধর করেন বলে অভিযোগ উঠেছে। শুধু তাই নয়, তাঁর সঙ্গে দুর্ব্যবহার এবং ধর্মীয় পরিচয়কে কেন্দ্র করে আপত্তিকর মন্তব্য করার অভিযোগও উঠেছে।
ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি এআইএমআইএম নেতা দানিশ আজিজের নজরে আসে। এরপর তাঁর নেতৃত্বে দলের একটি প্রতিনিধি দল বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে পুলিশ ও প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করে। দলের পক্ষ থেকে অভিযুক্তের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়।
এআইএমআইএমের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, পুরো বিষয়টি শান্তিপূর্ণ এবং সাংবিধানিক পথে পুলিশের কাছে তুলে ধরা হয়েছে। কোনও ধরনের উত্তেজনা বা আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার পরিবর্তে প্রশাসনের মাধ্যমে অভিযোগের নিষ্পত্তির চেষ্টা করা হয়েছে বলেও দলের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
পুলিশের তৎপরতায় গ্রেফতার অভিযুক্ত
অভিযোগের পর পুলিশ তদন্ত শুরু করে। এআইএমআইএম দলের সঙ্গে পুলিশের ধারাবাহিক যোগাযোগের পর ২৭ আগস্ট দুপুর প্রায় ১২টা নাগাদ অভিযুক্ত যুবককে গ্রেফতার করার খবর জানানো হয় বলে দলীয় সূত্রে দাবি করা হয়েছে।
জানা গিয়েছে, কালিপাহাড়ি এলাকায় অভিযুক্তের বাড়ি থেকে তাঁকে গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতারের পর ঘটনাটি নিয়ে পুলিশের তদন্ত আরও এগিয়েছে। ঘটনার সময় ঠিক কী ঘটেছিল, দু’পক্ষের মধ্যে বচসার কারণ কী ছিল এবং অভিযোগে যে মারধর ও ধর্মীয় মন্তব্যের কথা বলা হয়েছে, তার সত্যতা কতটা—এসব বিষয় তদন্তের মাধ্যমে খতিয়ে দেখা হবে।
এখনও পর্যন্ত অভিযোগের সবকটি বিষয় স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হয়নি। তাই তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত ঘটনাটিকে অভিযোগের ভিত্তিতেই দেখা হচ্ছে। পুলিশের তদন্ত এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্যের পরেই পুরো ঘটনার প্রকৃত চিত্র আরও পরিষ্কার হবে।
সাংবাদিক বৈঠকে সরব দানিশ আজিজ
অভিযুক্ত যুবকের গ্রেফতারের পর ২৮ আগস্ট এআইএমআইএম নেতা দানিশ আজিজ সাংবাদিক বৈঠক করেন। সেখানে তিনি পুরো ঘটনাকে কেন্দ্র করে নিজের বক্তব্য তুলে ধরেন। তাঁর বক্তব্যের মূল বিষয় ছিল—দেশের সংবিধান এবং আইনের শাসন সবার উপরে।
দানিশ আজিজ বলেন, ভারত একটি গণতান্ত্রিক দেশ এবং এখানে সংবিধানের ঊর্ধ্বে কোনও ব্যক্তি, সংগঠন বা রাজনৈতিক শক্তি থাকতে পারে না। তাঁর দাবি, দেশে যে রাজনৈতিক দলের সরকারই থাকুক না কেন, প্রশাসনকে সংবিধান ও আইনের ভিত্তিতেই কাজ করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, ভারতের সংবিধান প্রত্যেক নাগরিককে সমানাধিকার, সম্মান এবং ন্যায়বিচারের অধিকার দিয়েছে। কোনও ব্যক্তির ধর্ম, পোশাক, বিশ্বাস কিংবা ধর্মীয় যাত্রার ভিত্তিতে তাঁর সঙ্গে বৈষম্য বা দুর্ব্যবহার করা উচিত নয়।
‘আইনের চোখে সবাই সমান’
সাংবাদিক বৈঠকে দানিশ আজিজ বলেন, কোনও ব্যক্তি হিন্দু, মুসলিম, কাঁওয়ারিয়া, হজযাত্রী কিংবা অন্য কোনও ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মানুষ—পরিচয় যাই হোক না কেন, আইনের চোখে প্রত্যেকেই সমান।
তিনি বলেন, কোনও ব্যক্তির ধর্মীয় পরিচয়কে কেন্দ্র করে মারধর, অপমান বা ভয় দেখানোর অভিযোগ অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা উচিত। কোনও বিষয়ে বিরোধ তৈরি হলে আইন নিজের হাতে না নিয়ে পুলিশ এবং বিচারব্যবস্থার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করা উচিত বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
দানিশ আজিজের বক্তব্য, এই ঘটনায় তাঁদের দলের কর্মীরা কোনও সংঘাতের পথে না গিয়ে আইন ও সংবিধানের পথেই পুলিশের কাছে অভিযোগ জানিয়েছেন। তাঁর মতে, পুলিশ অভিযুক্তকে গ্রেফতার করায় প্রমাণ হয়েছে যে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সাংবিধানিক পদ্ধতিতেও ন্যায়বিচারের দাবি জানানো সম্ভব।
তিনি বলেন, “এই দেশে সংবিধানের চেয়ে বড় কেউ নেই এবং সংবিধানের ঊর্ধ্বে কেউ নেই। আইন সবার জন্য সমান। হিন্দু হোক, মুসলিম হোক, কাঁওয়ারিয়া হোক বা হজযাত্রী—প্রত্যেক নাগরিকের সম্মান, নিরাপত্তা এবং সমান বিচার পাওয়ার অধিকার রয়েছে।”
নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি
দানিশ আজিজ পুলিশ ও প্রশাসনের কাছে এই ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানান। অভিযোগে যে বিষয়গুলি সামনে এসেছে, সেগুলি যথাযথভাবে তদন্ত করে সত্যতা যাচাই করার পাশাপাশি অভিযোগ প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার আবেদন জানান তিনি।
ঘটনার পর ধর্মীয় যাত্রায় থাকা ব্যক্তিদের নিরাপত্তা নিয়েও নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। দীর্ঘ পথ পায়ে হেঁটে যাত্রা করা ব্যক্তিদের বিভিন্ন এলাকা অতিক্রম করতে হয়। সেই কারণে যাত্রাপথে তাঁদের নিরাপত্তা এবং প্রয়োজনীয় সহায়তার বিষয়টি প্রশাসনের কাছেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
গুলাম মুস্তাফার উদ্দেশ্য পায়ে হেঁটে হজযাত্রা করা। আসানসোলের মধ্য দিয়ে যাওয়ার সময় তাঁর সঙ্গে ঘটে যাওয়া এই ঘটনাকে ঘিরে এখন পুলিশের তদন্তের দিকেই নজর রয়েছে। অভিযুক্ত যুবকের গ্রেফতারের পর মামলায় পরবর্তী সময়ে কী ধরনের আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয় এবং তদন্তে কী তথ্য সামনে আসে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
এই ঘটনা একই সঙ্গে নাগরিক নিরাপত্তা, ধর্মীয় মর্যাদা, আইনের সমান প্রয়োগ এবং সাংবিধানিক অধিকারের প্রশ্নকে সামনে নিয়ে এসেছে। পুলিশি পদক্ষেপের পর অভিযোগকারী পক্ষের মধ্যে স্বস্তি দেখা গেলেও, পুরো ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত এবং আইন অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি অব্যাহত রয়েছে।






Leave a Reply