কলকাতা/বারাসত, ৭ মে ২০২৬
পশ্চিমবঙ্গে ভোট-পরবর্তী হিংসার আবহে এক চাঞ্চল্যকর ঘটনা সামনে এসেছে, যা রাজ্যের রাজনৈতিক মহলে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর ঘনিষ্ঠ সহকারী চন্দ্রনাথ রথকে খুন করা হয়েছে। এই ঘটনার পর থেকেই উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে রাজ্যের রাজনীতি।
জানা গিয়েছে, চন্দ্রনাথ রথ বারাসতের দিকে যাচ্ছিলেন, সেই সময় মোটরবাইকে আসা দুষ্কৃতীরা তাঁকে লক্ষ্য করে গুলি চালায়। বিজেপি নেতা অর্জুন সিং ও শঙ্করদেব পাণ্ডার দাবি, খুব কাছ থেকে তাঁকে গুলি করা হয়। গুরুতর আহত অবস্থায় তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলেও শেষরক্ষা হয়নি।
‘শুভেন্দুর ছায়া’ হিসেবে পরিচিত ছিলেন
চন্দ্রনাথ রথ শুধুমাত্র একজন সহকারী ছিলেন না, বরং শুভেন্দু অধিকারীর সবচেয়ে বিশ্বস্ত ও নির্ভরযোগ্য সহযোগী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। গত প্রায় ৮ বছর ধরে তাঁদের সম্পর্ক ছিল গভীর আস্থার উপর ভিত্তি করে।
শুভেন্দুর ফাইল সামলানো থেকে শুরু করে সভা, মিছিল এবং রাজনৈতিক কৌশল তৈরি—সবকিছুতেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতেন চন্দ্রনাথ। রাজনৈতিক মহলে তাঁকে প্রায়ই “শুভেন্দুর ছায়া” বলা হত।
বায়ুসেনা থেকে রাজনীতির ময়দানে
পূর্ব মেদিনীপুরের চাঁদিপুরে জন্ম চন্দ্রনাথ রথের। ছোটবেলা থেকেই তিনি মেধাবী ছাত্র হিসেবে পরিচিত ছিলেন। উত্তর ২৪ পরগনার রাহড়া রামকৃষ্ণ মিশন থেকে তিনি মাধ্যমিক পরীক্ষায় কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হন।
পরবর্তীতে উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করে শর্ট সার্ভিস কমিশনের মাধ্যমে ভারতীয় বায়ুসেনায় অফিসার হিসেবে যোগ দেন। বহু বছর দেশসেবা করার পর তিনি বায়ুসেনা থেকে অবসর নিয়ে রাজনীতিতে প্রবেশ করেন।
মায়ের অনুপ্রেরণায় রাজনীতিতে আগমন
চন্দ্রনাথের পরিবারে রাজনীতির প্রভাব আগে থেকেই ছিল। তাঁর মা চাঁদিপুর পঞ্চায়েত সমিতির সদস্য ছিলেন। তাঁর কাছ থেকেই চন্দ্রনাথ রাজনৈতিক চেতনা ও জনসেবার প্রেরণা পান।
বায়ুসেনা থেকে ফেরার পর তিনি পুরোপুরি শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে কাজ শুরু করেন এবং ধীরে ধীরে তাঁর সবচেয়ে কাছের মানুষ হয়ে ওঠেন।
কৌশলের কারিগর, পর্দার আড়ালের মুখ্য ভূমিকা
২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচন থেকে শুরু করে পরবর্তী রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ—সব ক্ষেত্রেই চন্দ্রনাথ রথ ছিলেন গুরুত্বপূর্ণ পরিকল্পনাকারী।
নন্দীগ্রাম ও ভবানীপুরের মতো গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনে শুভেন্দুর প্রচার, সভা, কর্মসূচি ও কৌশল নির্ধারণে তাঁর ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কলকাতায় শুভেন্দুর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডও তিনি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করতেন।
শপথের ৪৮ ঘণ্টা আগে মৃত্যু
সবচেয়ে মর্মান্তিক বিষয় হল, নতুন সরকারের শপথ গ্রহণের মাত্র ৪৮ ঘণ্টা আগে এই নৃশংস হত্যাকাণ্ড ঘটে। যেভাবে তাঁকে লক্ষ্য করে গুলি করা হয়েছে, তাতে অনুমান করা হচ্ছে—এই হামলার পিছনে দীর্ঘদিন ধরে পরিকল্পনা চলছিল।
উঠছে একাধিক প্রশ্ন
- এই হত্যাকাণ্ড কি পূর্বপরিকল্পিত?
- কারা বা কোন গোষ্ঠী এর পিছনে রয়েছে?
- কেনই বা এত কাছ থেকে গুলি করা হল?
এই সমস্ত প্রশ্নের উত্তর এখন তদন্তের উপর নির্ভর করছে। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—চন্দ্রনাথ রথের মৃত্যু শুধু একটি ব্যক্তিগত ক্ষতি নয়, বরং বাংলার রাজনৈতিক অঙ্গনে এক বড় শূন্যতা তৈরি করেছে।















