কলকাতা: পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় মঙ্গলবার দুর্নীতির বিরুদ্ধে কড়া অবস্থান নিয়ে বড় বার্তা দিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেন, তার সরকার দুর্নীতির ক্ষেত্রে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণ করছে এবং ভবিষ্যতে আরও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
রাজ্যপালের ভাষণের ওপর ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি ঘোষণা করেন, অধিবেশনের শেষ দিনে দুর্নীতি রোধে একটি নতুন ও কঠোর আইন আনা হবে। এই আইনে দোষী প্রমাণিত হলে শুধু জেল নয়, দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত সম্পত্তিও বাজেয়াপ্ত করে নিলাম করা হবে।
তিনি বলেন, অনেকেই ভাবেন কিছুদিন জেলে থেকে আইনি লড়াই করে বেরিয়ে আসা যাবে, কিন্তু এখন আর সেই সুযোগ থাকবে না। দুর্নীতির টাকায় তৈরি সম্পত্তি সরকার অধিগ্রহণ করে জনকল্যাণমূলক কাজে ব্যবহার করতে পারে বলেও ইঙ্গিত দেন তিনি। কলকাতার কিছু বিলাসবহুল ভবন দরিদ্র মানুষের কাজে লাগানোর কথাও উল্লেখ করেন।
ভাষণে শুভেন্দু অধিকারী দাবি করেন, তার সরকার কোনও দুর্নীতিগ্রস্ত নেতাকে রেহাই দেবে না। তিনি তৃণমূল কংগ্রেসের একাধিক নেতার বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে বলেন, দুর্নীতির তদন্ত আরও জোরদার হবে। প্রাক্তন বিধাননগর পুরসভার চেয়ারম্যান সব্যসাচী দত্তর প্রসঙ্গ টেনে তিনি জানান, তদন্তে বিপুল পরিমাণ সোনা ও রূপো উদ্ধারের তথ্য সামনে এসেছে।
পূর্ববর্তী সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, বেঙ্গল গ্লোবাল বিজনেস সামিটের জন্য ফিক্কিকে নিয়মবহির্ভূতভাবে ৩২৪ কোটির বেশি টাকা দেওয়া হয়েছিল। এই ঘটনার তদন্তে অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি বিশ্বজিৎ বসুর নেতৃত্বে একটি কমিশন গঠন করা হয়েছে। কমিশনের সদস্য-সচিব হিসেবে রয়েছেন এডিজি পদমর্যাদার আইপিএস অফিসার কে. জয়ারামন।
তিনি আরও জানান, মনরেগা, আবাস যোজনা, জল জীবন মিশনসহ বিভিন্ন প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ এই কমিশনের মাধ্যমে খতিয়ে দেখা হবে।
সরকারি চাকরির নিয়োগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ভবিষ্যতে সম্পূর্ণ স্বচ্ছতার সঙ্গে নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে। কোনও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বরদাস্ত করা হবে না এবং ইউপিএসসি-র আদলে নিয়োগ করা হবে।
রাজস্ব প্রসঙ্গে তিনি দাবি করেন, আগে বীরভূমের পাথর খাদান থেকে সরকার খুব কম আয় করত, কিন্তু বর্তমানে সেই আয়ে উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি হয়েছে। অতীতে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব সরকারি কোষাগারে জমা পড়ত না বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
বিরোধী দলনেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়কেও কটাক্ষ করেন তিনি। রাস্তার নাম পরিবর্তনের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, কলকাতায় আর মুঘল বা পাঠান শাসকদের নামে রাস্তার নাম থাকবে না। এই বিষয়ে পর্যালোচনার জন্য একটি কমিটি গঠন করা হবে।
২০২১ সালের নির্বাচনের পরবর্তী হিংসার প্রসঙ্গও তোলেন শুভেন্দু। তিনি বলেন, সেই সময় বহু মামলা দায়ের হয়েছিল। বিরোধী দলনেতা থাকাকালীন তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা দায়ের করা হয়েছিল বলেও অভিযোগ করেন।
কালীগঞ্জের বিধায়ক আলিফা আহমেদের বক্তব্য চলাকালীন বিজেপি বিধায়কদের ‘তামান্না’ ইস্যু তোলার প্রসঙ্গ উল্লেখ করে তিনি বলেন, যারা গণতন্ত্রের কথা বলেন, তাদের আগে ওই ঘটনার জবাব দেওয়া উচিত।
ভাষণের শেষদিকে কিছু বিধায়ক ওয়াকআউট করলে তাতেও কটাক্ষ করেন তিনি। অন্যদিকে বিধায়ক কুণাল ঘোষ দুর্নীতিবিরোধী পদক্ষেপকে সমর্থন করে বলেন, যে কোনও দলের নেতার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে সমানভাবে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
অনুপ্রবেশ প্রসঙ্গে তিনি জানান, ইতিমধ্যেই ১০ হাজার অনুপ্রবেশকারীকে চিহ্নিত করে ফেরত পাঠানো হয়েছে। ১২টি হোল্ডিং সেন্টারে প্রায় ১৮০০ মানুষ রয়েছে। সীমান্ত সুরক্ষার জন্য বিএসএফ-কে ১৪২.৭৯ একর জমি দেওয়া হয়েছে এবং আগামী কয়েক মাসের মধ্যে ৬০০ কিলোমিটার এলাকায় বেড়া দেওয়ার কাজ শেষ হবে।
ভাষণের শেষে ‘সবকা সাথ, সবকা বিকাশ’ স্লোগানের উল্লেখ করে তিনি সর্বস্তরের মানুষের উন্নয়নের কথা বলেন।
এই ঘোষণার পর রাজ্যের রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে এবং নতুন আইনের প্রভাব নিয়ে শুরু হয়েছে জোর চর্চা।

