কলকাতা/আসানসোল: পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে তৃণমূল কংগ্রেসের অন্দরে ভাঙনের জল্পনা যখন তুঙ্গে, তখনই সমস্ত বিতর্কে ইতি টানলেন আসানসোলের সাংসদ শত্রুঘ্ন সিনহা। তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিলেন, তিনি তৃণমূল কংগ্রেস এবং দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গেই আছেন।
‘বিহারি বাবু’ নামে পরিচিত শত্রুঘ্ন সিনহা অভিযোগ করেন, দলের কঠিন সময়ে তাঁর বিরুদ্ধে পরিকল্পিতভাবে গুজব ছড়ানো হচ্ছে। তাঁকে বিদ্রোহী গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা চলছে, যা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন।
২০২২ সালের আসানসোল লোকসভা উপনির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেস তাঁকে প্রার্থী করে। বিজেপি ছেড়ে তৃণমূলে যোগ দেওয়া বাবুল সুপ্রিয়োর ইস্তফার পর এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সেই সময় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর উপর ভরসা রেখেছিলেন এবং শত্রুঘ্ন সিনহাও সেই আস্থার মর্যাদা রেখে তিন লক্ষেরও বেশি ভোটে জয়ী হন।
এই নির্বাচনে বিজেপির প্রার্থী ছিলেন স্থানীয় নেত্রী অগ্নিমিত্রা পাল। প্রচারের সময় শত্রুঘ্নকে ‘বহিরাগত’ বলে প্রচার করা হলেও, ভোটাররা সেই যুক্তি খারিজ করে দিয়ে তাঁকে বিপুল সমর্থন দেন।
পরবর্তীতে ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেস আবারও তাঁকে প্রার্থী করে এবং তিনি দ্বিতীয়বারের মতো জয়ী হন। যদিও এইবার জয়ের ব্যবধান কিছুটা কমে যায়, তবুও তিনি এক লক্ষের বেশি ভোটে এগিয়ে ছিলেন।
২০২৬ সালের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূলের প্রত্যাশিত ফল না হওয়ায় দলের ভিতরে অসন্তোষ বাড়তে থাকে। একাধিক নেতা প্রকাশ্যে নেতৃত্বের সমালোচনা করেন। এরই মধ্যে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে শুভেচ্ছা জানানোর পর শত্রুঘ্ন সিনহার রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে নতুন করে জল্পনা শুরু হয়।
সামাজিক মাধ্যম এক্স-এ তিনি নরেন্দ্র মোদীকে দেশের পথপ্রদর্শক বলে উল্লেখ করেন এবং তাঁর দীর্ঘায়ু কামনা করেন। এই মন্তব্যের পর থেকেই তাঁর দলবদলের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়।

একই সঙ্গে গুঞ্জন ওঠে যে লোকসভা স্পিকারকে পাঠানো একটি তথাকথিত চিঠিতে বিদ্রোহী তৃণমূল সাংসদদের তালিকায় তাঁর নাম রয়েছে। এমনকি কাকলি ঘোষ দস্তিদারের নেতৃত্বাধীন একটি গোষ্ঠীতে যোগ দেওয়ার সম্ভাবনাও উড়ে বেড়াতে থাকে।
তবে সমস্ত জল্পনা একেবারে উড়িয়ে দিয়ে শত্রুঘ্ন সিনহা বলেন, তিনি কোনও চিঠিতে স্বাক্ষর করেননি এবং কোনও বিদ্রোহী গোষ্ঠীর সঙ্গে তাঁর কোনও যোগাযোগ নেই। তাঁর কথায়, “সত্য কথা বলা যদি বিদ্রোহ হয়, তবে আমাকে বিদ্রোহী বলা যেতে পারে, কিন্তু কোনও গোষ্ঠীর সঙ্গে আমাকে যুক্ত করা ঠিক নয়।”
তিনি আরও বলেন, ২০১৯ সালে যখন তিনি কঠিন সময়ের মধ্যে ছিলেন, তখন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। তাঁর অনুরোধেই তিনি আসানসোল থেকে নির্বাচন লড়েন এবং দু’বার জয়ী হন। তাই এই সময়ে দলনেত্রীকে ছেড়ে যাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না।
শত্রুঘ্ন সিনহা জানান, তৃণমূল কংগ্রেসের প্রতীক ‘জোড়া ফুল’-এ জিতে তিনি সংসদে গিয়েছেন, তাই দলের প্রতি তাঁর দায়বদ্ধতা রয়েছে। তিনি ভবিষ্যতেও পশ্চিমবঙ্গ ও আসানসোলের মানুষের জন্য কাজ চালিয়ে যাবেন বলে আশ্বাস দেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, শত্রুঘ্ন সিনহার এই মন্তব্যে আপাতত তৃণমূলের অন্দরের অশান্তি কিছুটা প্রশমিত হতে পারে। তবে রাজ্যের রাজনীতিতে পরিস্থিতি এখনও অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং আগামী দিনে নতুন সমীকরণ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।















