তৃণমূলে তীব্র অন্দরের ঝড়! মমতা কি ফের নিজের হাতে নেবেন দলের সম্পূর্ণ দায়িত্ব?

single balaji

পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে আবারও চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে তৃণমূল কংগ্রেসের অন্দরের টানাপোড়েন। সাম্প্রতিক নির্বাচনী ধাক্কার পর থেকেই দলের ভিতরে অসন্তোষ ক্রমশ প্রকাশ্যে আসছে। এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি সমালোচনার মুখে পড়েছেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়, যাকে ঘিরেই দলের একাংশের ক্ষোভ কেন্দ্রীভূত হচ্ছে।

এই প্রেক্ষাপটে তৃণমূলের সাংসদ ও প্রবীণ নেতা কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় সরাসরি অভিষেকের বিরুদ্ধে মুখ খুলে দলের ভিতরের অস্বস্তিকে আরও সামনে নিয়ে এসেছেন। তাঁর অভিযোগ, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্যই দলকে জনসমক্ষে সমালোচনার মুখে পড়তে হচ্ছে। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, বর্তমান পরিস্থিতির জন্য অভিষেকই দায়ী, অথচ তাঁর আচরণে কোনও পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে না। এমনকি তিনি চরম মন্তব্য করে জানান, দলে হয় অভিষেক থাকবেন, নয়তো তিনি—এখন সিদ্ধান্ত নিতে হবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কেই।

বিতর্ক আরও জোরদার হয় যখন অভিযোগ ওঠে যে, বিধায়কের স্বাক্ষর জালিয়াতি সংক্রান্ত একটি মামলায় কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছেলে শীর্ষণ্য বন্দ্যোপাধ্যায়কে গভীর রাতে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের দপ্তর থেকে ফোন করে জানানো হয়, তাঁর আইনি পরিষেবার আর প্রয়োজন নেই। এই ঘটনার পরেই কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় প্রকাশ্যে ক্ষোভ উগরে দেন। দলের অন্দরে শোনা যাচ্ছে, অনেকেই হয়তো প্রকাশ্যে কিছু বলছেন না, কিন্তু তাঁদের মনোভাবও প্রায় একই রকম।

দলের প্রাক্তন মুখপাত্র ও বর্তমানে সাসপেন্ড হওয়া নেতা ঋজু দত্ত বলেন, ২০২১ সালের পর থেকেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উচিত ছিল অভিষেককে নিয়ন্ত্রণে রাখা, কিন্তু তা হয়নি। তাঁর মতে, আজও সেই পরিস্থিতির কোনও পরিবর্তন ঘটেনি।

নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর থেকে কালীঘাটে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়িতে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক হয়েছে। সেখানে কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়, কুণাল ঘোষ, চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য এবং শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়ের মতো নেতারা উপস্থিত ছিলেন। তবে উল্লেখযোগ্যভাবে, ক্ষুব্ধ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় একদিন কালীঘাটে যাননি, যা রাজনৈতিক মহলে নতুন করে জল্পনা বাড়িয়েছে।

কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের দাবি, তিনি রাজ্যসভার সাংসদ ডেরেক ও’ব্রায়েনকে ফোন করে পুরো বিষয়টি জানিয়েছিলেন এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে বার্তা পৌঁছে দিতে বলেছিলেন। কিন্তু সারাদিনে তিনি কোনও প্রতিক্রিয়া পাননি। রাতে তিনি জানান, তিনি সরাসরি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছ থেকে শুনতে চান দলের ভবিষ্যৎ কী হবে। যদি শুধুমাত্র অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ওপর নির্ভর করেই দল এগোতে চায়, তাহলে তাঁর সামনে দল ছাড়ার পথই খোলা থাকবে।

অন্যদিকে কুণাল ঘোষ স্পষ্ট করে দেন যে তিনি কখনও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করবেন না এবং সবসময় তাঁর পাশে থাকবেন। তবে তিনি এটাও বলেন, যদি দল একই ভুল বারবার করে, তাহলে তিনি নিজের মতামত প্রকাশ করতে পিছপা হবেন না। তিনি লোকসভায় একাধিক সাংসদের দলত্যাগকে সংসদীয় নেতৃত্বের ব্যর্থতা বলেও মন্তব্য করেন।

WhatsApp Image 2026 05 31 at 16.13.03

তৃণমূলের ছাত্রনেতা কোহিনূর মজুমদারও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তাঁর মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে দলের মধ্যে কাজ করা কঠিন হয়ে উঠছে। তিনি প্রস্তাব দেন, সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক পদটি তুলে দিয়ে অভিষেককে সাধারণ কর্মী হিসেবে কাজ করা উচিত।

এই সমস্ত ঘটনার মধ্যেই জল্পনা তুঙ্গে—মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কি আবার দলের পূর্ণ দায়িত্ব নিজের হাতে নেবেন, নাকি অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কেই সামনে রেখে বর্তমান কাঠামো বজায় থাকবে? পারিবারিক সম্পর্ক ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের এই টানাপোড়েন তৃণমূলের ভবিষ্যৎ নিয়ে বড় প্রশ্নচিহ্ন তুলে দিয়েছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক শুভময় মৈত্র মনে করেন, পরিবারকেন্দ্রিক দলগুলিতে নেতৃত্ব বদলের প্রশ্ন নতুন কিছু নয়। তিনি কংগ্রেস ও রাহুল গান্ধীর উদাহরণ টেনে বলেন, এই ধরনের দলে পারিবারিক প্রভাব সবসময়ই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ফলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্য এই সিদ্ধান্ত নেওয়া মোটেও সহজ হবে না।

এই মুহূর্তে তৃণমূল কংগ্রেসের অন্দরে নেতৃত্ব ও সংগঠন নিয়ে যে প্রশ্ন উঠছে, তা রাজ্য রাজনীতিতে নতুন করে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। এখন সকলের নজর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে।

ezgif 22b6a523914e707e 300x300 1
ghanty

Leave a comment