তারাতলায় মর্মান্তিক দুর্ঘটনা: গ্রেফতার গুদাম মালিক শম্ভুনাথ বেহেরা, মৃত ৫

কলকাতা: মহানগর কলকাতার তারাতলা এলাকায় ভয়াবহ গুদাম ধসের ঘটনায় তীব্র চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় এখনও পর্যন্ত ৫ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং ২৪ জন আহত অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। ঘটনায় বড় পদক্ষেপ নিয়ে পুলিশ গুদাম মালিক শম্ভুনাথ বেহেরা-কে গ্রেফতার করেছে।

পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, বুধবার গভীর রাতে তারাতলা এলাকার একটি আবাসন থেকে শম্ভুনাথ বেহেরাকে আটক করা হয়। পুলিশের তরফে স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে তাঁর বিরুদ্ধে অনিচ্ছাকৃত হত্যার মামলা দায়ের করা হয়েছে।

ঘটনার পর পুলিশ প্রথমে গুদামের সুপারভাইজারসহ প্রায় ৯ জনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করে। পরবর্তীতে শম্ভুনাথ বেহেরাসহ মোট ৫ জনকে গ্রেফতার করা হয়। ধৃতদের মধ্যে রয়েছেন স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ার কমল সামন্ত, সুপারভাইজার সৈয়দ মোহাম্মদ গুলজার, শ্রমিক সরবরাহকারী মোহাম্মদ আতাউল এবং সুভাষ সরকার

বৃহস্পতিবার সকাল পর্যন্ত জাতীয় বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী এবং রাজ্য বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনীর দল ঘটনাস্থলে উদ্ধারকাজ চালিয়ে যায়। এখনও ধ্বংসস্তূপের নিচে কয়েকজন আটকে থাকতে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। হাইড্রোলিক ক্রেনের সাহায্যে ভেঙে পড়া কাঠামো সামলে রেখে উদ্ধারকাজ চালানো হচ্ছে।

এখনও পর্যন্ত মোট ২৯ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ৫ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং ২৪ জন আহত এসএসকেএম হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। আহতদের মধ্যে ২ জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, মৃতদের মধ্যে ৪ জন নদিয়া জেলার বাসিন্দা এবং একজন উত্তর ২৪ পরগনার ভাটপাড়ার বাসিন্দা।

এই ঘটনার তদন্তে পুলিশ একটি বিশেষ তদন্তকারী দল (এসআইটি) গঠন করেছে। এই দলে কলকাতা পুলিশের ডিটেকটিভ ডিপার্টমেন্টের এক সহকারী পুলিশ কমিশনার পদমর্যাদার আধিকারিক, হোমিসাইড শাখার দায়িত্বপ্রাপ্ত অফিসারসহ মোট ৪ জন এবং তারাতলা থানার ২ জন সাব-ইন্সপেক্টর রয়েছেন। গোটা তদন্তের তদারকি করবেন ডিটেকটিভ ডিপার্টমেন্টের ডেপুটি কমিশনার।

উল্লেখ্য, বুধবার দুপুর ১২টা ৭ মিনিট নাগাদ নির্মীয়মাণ গুদামের ছাদ আচমকাই ভেঙে পড়ে। লোহার ভারী কাঠামো এবং কংক্রিটের ধ্বংসস্তূপের নিচে প্রায় ৪০ জন শ্রমিক চাপা পড়ে যান। সঙ্গে সঙ্গে পুলিশ, দমকল এবং রাজ্য বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী উদ্ধারকাজ শুরু করে। পরে রাজ্য সরকারের অনুরোধে ভারতীয় সেনা এবং জাতীয় বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনীও উদ্ধার অভিযানে যোগ দেয়।

ঘটনাস্থলে একাধিক ক্রেন মোতায়েন করা হয় এবং ভারী লোহার বিম সরিয়ে আটকে পড়া শ্রমিকদের বের করার চেষ্টা চালানো হয়। পাশাপাশি গ্যাস কাটারের সাহায্যে লোহার কাঠামো কেটে উদ্ধার পথ তৈরি করা হয়, যার ফলে বেশ কয়েকজনকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়।

কলকাতা পুরসভার সূত্রে জানা গেছে, যে জমিতে এই গুদামটি তৈরি হচ্ছিল তা বন্দর কর্তৃপক্ষের অধীনে। ২০২৪ সালের আগস্ট মাসে এই জমি ৩০ বছরের জন্য ‘বেহেরা ব্রাদার্স’ নামক একটি সংস্থাকে লিজ দেওয়া হয়। এই সংস্থা মূলত চা পাতা সংরক্ষণ ও প্যাকেজিংয়ের কাজ করে। শম্ভুনাথ বেহেরা এই সংস্থার অন্যতম প্রধান মালিক এবং নির্মাণকাজের তদারকির দায়িত্বে ছিলেন।

প্রাথমিক তদন্তে নির্মাণে গাফিলতির অভিযোগ উঠে এসেছে, যা এই ভয়াবহ দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ বলে মনে করা হচ্ছে। এই ঘটনা শহরের নির্মাণ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।

রাজনৈতিক মহলেও এই ঘটনা নিয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। দোষীদের কঠোর শাস্তি এবং মৃতদের পরিবারের জন্য উপযুক্ত ক্ষতিপূরণের দাবি জোরদার হচ্ছে।

Leave a comment