কলকাতা: পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে নতুন করে উত্তেজনা ছড়াল বিধানসভার ‘সই জালিয়াতি’ বিতর্ককে ঘিরে। এই ঘটনায় তৃণমূল কংগ্রেস নিজেদেরই দুই বিধায়ক—ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় ও সন্দীপন সাহাকে দল থেকে বহিষ্কার করেছে, যা রাজনৈতিক মহলে বড় প্রশ্নচিহ্ন তৈরি করেছে।
মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী দাবি করেছেন, এই গোটা কেলেঙ্কারির সূত্রপাত হয়েছে তৃণমূলেরই দুই বিধায়কের অভিযোগের ভিত্তিতে। তাঁর এই মন্তব্যের পরই দ্রুত পদক্ষেপ নেয় তৃণমূল নেতৃত্ব এবং ‘দলবিরোধী কার্যকলাপ’-এর অভিযোগে দুই বিধায়ককে বহিষ্কার করা হয়।

ঘটনার সূত্রপাত ৬ মে কালীঘাটে আয়োজিত এক বৈঠক থেকে। ওই বৈঠকে বিরোধী দলনেতা হিসেবে শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়ের নাম প্রস্তাব করা হয়। উপস্থিত বিধায়করা হাত তুলে সমর্থন জানান। কিন্তু অভিযোগ, সেই প্রস্তাব সরাসরি বিধানসভায় জমা পড়েনি। পরে ১৯ মে একটি নথি জমা দেওয়া হয়, যেখানে ৭০ জন বিধায়কের সই দেখানো হয়।
বিধানসভার সচিবালয় নথি খতিয়ে দেখে দেখতে পায়, বহু সই নিয়ম অনুযায়ী হয়নি। শপথগ্রহণের সময় দেওয়া সইয়ের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হলে প্রায় ২০ জন বিধায়কের সই মেলেনি বলে অভিযোগ ওঠে। এরপরই জাল সইয়ের অভিযোগে FIR দায়ের করা হয় এবং তদন্তভার দেওয়া হয় রাজ্য CID-কে।
CID ইতিমধ্যেই একাধিক বিধায়কের বাড়িতে গিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। চৌরঙ্গির নয়না বন্দ্যোপাধ্যায়, বেলেঘাটার কুণাল ঘোষ, ডোমজুড়ের তাপস মাইতি ও ক্যানিং পূর্বের বাহারুল ইসলামকে জেরা করা হয়েছে। বাহারুল ইসলাম দাবি করেছেন, ৬ মে তিনি কোনও বৈঠকেই উপস্থিত ছিলেন না, অথচ তাঁর নামে সই দেখানো হয়েছে।

এদিকে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে এই মামলায় তলব করা হলেও অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে তিনি সময় চেয়েছেন। CID তাঁর কালীঘাটের বাড়িতে নোটিস দিতে গেলেও মূল ফটক বন্ধ থাকায় পরে অফিসের কর্মীর মাধ্যমে নোটিস পৌঁছে দেওয়া হয়।
ঋতব্রত ও সন্দীপনের দাবি, ৬ মে-র বৈঠকে বিরোধী দলনেতা নিয়ে কোনও আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত হয়নি। শুধুমাত্র উপস্থিতির খাতায় দেওয়া সইকে পরে প্রস্তাব হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। তাঁরা প্রশ্ন তুলেছেন—“সত্য বলার জন্য কি শাস্তি পাওয়া উচিত?”
অন্যদিকে তৃণমূলের নেতা কুণাল ঘোষ এই দুই বিধায়ককে ‘বিশ্বাসঘাতক’ বলে কটাক্ষ করেছেন। তাঁর মতে, দলের বিরুদ্ধে এত অভিযোগ থাকলে তাঁদের নির্বাচনেই লড়া উচিত ছিল না।
মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এই ঘটনাকে ‘অভিজ্ঞ চোরদের কাজ’ বলে তীব্র আক্রমণ করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, সই জালিয়াতির প্রমাণ মিললে কড়া আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং ইতিমধ্যেই ফরেনসিক তদন্ত শুরু হয়েছে।
প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও এই ঘটনায় প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেছেন, এই দুই ব্যক্তিকে টিকিট দেওয়া তাঁর ভুল ছিল। তিনি অভিযোগ করেছেন, দলের ভিতরে ভাঙন ধরানোর চক্রান্ত চলছে এবং কিছু নেতা অন্য দলে যোগ দেওয়ার চেষ্টা করছেন।
এই ঘটনাকে ঘিরে এখন তৃণমূলের অন্দরেই দ্বন্দ্ব চরমে উঠেছে। রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বিতর্ক আগামী দিনে রাজ্যের রাজনীতিতে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।















