কলকাতা: পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন উত্তাপ ছড়াল শনিবারের ব্রিগেড সভা। কলকাতার ঐতিহাসিক ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে আয়োজিত বিশাল জনসভা থেকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী শুধু “পরিবর্তন”-এর ডাকই দিলেন না, বরং ক্ষমতার পালাবদলের পরে “হিসাব নেওয়া হবে” বলেও কড়া সতর্কবার্তা দিলেন।
প্রায় ৪৫ মিনিটের দীর্ঘ বক্তৃতার মাত্র সাত মিনিটের মাথাতেই তাঁর কণ্ঠে সতর্কতার সুর শোনা যায়। তিনি বলেন,
“সেই দিন আর দূরে নয়, যখন পশ্চিমবঙ্গে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হবে।”
এরপর তিনি আরও যোগ করেন,
“কোনও অত্যাচারীকে ছাড়া হবে না। খুঁজে খুঁজে সবার হিসাব নেওয়া হবে।”
বদলাচ্ছে বিজেপির রাজনৈতিক ভাষা
সাম্প্রতিক সময়ে পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন সভায় নরেন্দ্র মোদী বারবার “পরিবর্তন”-এর কথা বলছিলেন এবং তৃণমূল কংগ্রেস সরকারের বিরুদ্ধে তীব্র সমালোচনা করছিলেন। কিন্তু শনিবারের ব্রিগেড সভায় তিনি এক ধাপ এগিয়ে স্পষ্টভাবে বলেন যে ক্ষমতা পরিবর্তনের পরে অনেককেই জবাবদিহি করতে হবে।
তাঁর পুরো বক্তৃতায় অন্তত তিনবার এই ধরনের সতর্কবার্তা শোনা যায়, যা রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে বিজেপির কৌশলে নতুন সুরের ইঙ্গিত।
ব্রিগেডে জনসমুদ্র
শনিবারের এই সভাকে রাজ্য বিজেপির অন্যতম বৃহত্তম সমাবেশ বলে দাবি করা হচ্ছে। সভায় বিপুল জনসমাগম দেখা যায়।
- দক্ষিণবঙ্গের বিভিন্ন জেলা থেকে বাসে করে কর্মী-সমর্থকদের আনা হয়
- উত্তরবঙ্গ থেকে প্রায় ১৬টি ট্রেন ভাড়া করে মানুষকে কলকাতায় আনা হয়
দুপুরের পর থেকেই ব্রিগেড মাঠ ও আশপাশের এলাকা বাস ও মানুষের ভিড়ে ভরে যায়।
তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ব্রিগেডে বড় জমায়েত মানেই ভোটে সাফল্য নিশ্চিত নয়। অতীতেও বামফ্রন্ট আমলে এখানে বড় বড় সভা হয়েছে, কিন্তু নির্বাচনের ফল অনেক সময় আলাদা হয়েছে।
‘পরিবর্তন যাত্রা’র সমাপ্তি
রাজ্যজুড়ে বিজেপির ‘পরিবর্তন যাত্রা’-র সমাপ্তিও এই ব্রিগেড সভার মধ্য দিয়েই হয়। এই কর্মসূচি ১ মার্চ থেকে ১০ মার্চ পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় অনুষ্ঠিত হয়েছিল।
সভা শুরুতেই জনতার উদ্দেশে নরেন্দ্র মোদী বলেন,
“যেদিকে তাকাচ্ছি শুধু মানুষ আর মানুষ দেখা যাচ্ছে।”
তিনি অভিযোগ করেন, এই সভা আটকাতে তৃণমূল কংগ্রেস নানাভাবে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেছে—রাস্তা বন্ধ করা, যানজট তৈরি করা, গাড়ি আটকে দেওয়া, পোস্টার ছেঁড়া এবং পতাকা সরিয়ে দেওয়া—কিন্তু তবুও মানুষ সভায় পৌঁছেছেন।
কেন্দ্রীয় প্রকল্প নিয়ে আক্রমণ
বক্তৃতায় প্রধানমন্ত্রী অভিযোগ করেন যে পশ্চিমবঙ্গে কেন্দ্র সরকারের বহু প্রকল্প কার্যকর হতে দেওয়া হচ্ছে না।
তিনি উল্লেখ করেন—
- প্রধানমন্ত্রী বিশ্বকর্মা প্রকল্প
- প্রধানমন্ত্রী সূর্য ঘর প্রকল্প
- আয়ুষ্মান ভারত প্রকল্প
- চা-বাগান শ্রমিকদের জন্য বিভিন্ন কল্যাণমূলক প্রকল্প
তিনি আরও অভিযোগ করেন যে প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনার নাম বদলে দেওয়া হয়েছে এবং উপভোক্তাদের তালিকায় অনিয়ম হয়েছে।
জল জীবন মিশন ও উন্নয়ন প্রসঙ্গ
নরেন্দ্র মোদীর দাবি, দেশের অনেক রাজ্যে জল জীবন মিশনের মাধ্যমে ঘরে ঘরে পাইপলাইনের জল পৌঁছে গেছে, কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের বহু মানুষ এখনও সেই সুবিধা থেকে বঞ্চিত।
তিনি তৃণমূল সরকারের উদ্দেশে কটাক্ষ করে বলেন,
“ওদের নীতি হল—নিজেরা কাজ করবে না, অন্য কাউকেও করতে দেবে না।”
কর্মসংস্থান ও নারী নিরাপত্তা
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিজেপি সরকার এলে পড়াশোনা শেষ করার পর পশ্চিমবঙ্গের যুবকদের রাজ্যেই কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা হবে।
নারী নিরাপত্তা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, মহিলাদের বিরুদ্ধে অপরাধ করলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং অপরাধীদের জেলে পাঠানো হবে।
“তৃণমূল সরকারের কাউন্টডাউন শুরু”
বক্তৃতার প্রায় ৩৭ মিনিটের মাথায় তিনি বলেন, তৃণমূল সরকারের দিন গোনা শুরু হয়ে গেছে।
তিনি জানান, বিজেপি সরকার গঠন হলে একদিকে “সবকা সাথ, সবকা বিকাশ” নীতিতে উন্নয়নের কাজ চলবে, অন্যদিকে অত্যাচার ও দুর্নীতির জন্য জবাবদিহি নিশ্চিত করা হবে।
মুখ্যমন্ত্রীর নাম উচ্চারণ করেননি
উল্লেখযোগ্যভাবে, পুরো বক্তৃতায় নরেন্দ্র মোদী মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম সরাসরি উল্লেখ করেননি। তবে তিনি বারবার রাজ্য সরকারকে “নির্মম সরকার” বলে আক্রমণ করেন।
তিনি রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর কথিত অপমানের প্রসঙ্গও তুলে ধরেন, যা তাঁর মতে আদিবাসী সমাজ, সংবিধান এবং দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদকে অসম্মান করার সমান।
“এবারের ভোট বাংলার আত্মা রক্ষার লড়াই”
বক্তৃতার শেষে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ব্রিগেডে যে বিপুল জনসমাগম দেখা গেছে তা পশ্চিমবঙ্গের জাগ্রত চেতনার প্রতীক।
তিনি বলেন,
“এবারের নির্বাচন শুধু সরকার বদলের নির্বাচন নয়। এটি বাংলার আত্মাকে রক্ষা করার, ভয়ের পরিবেশ শেষ করার এবং পুরো ব্যবস্থাকে বদলে দেওয়ার নির্বাচন।”














