পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে ফের চমক। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় রাজ্য সরকারের ‘যুবসাথী’ প্রকল্পের আওতা আরও বাড়ানোর ঘোষণা করেছেন। এবার উচ্চশিক্ষায় পড়ুয়া এবং বিভিন্ন সরকারি বা বেসরকারি বৃত্তিপ্রাপ্ত ছাত্রছাত্রীরাও এই প্রকল্পের সুবিধা পাবেন। অর্থাৎ পড়াশোনার পাশাপাশি যারা চাকরি খুঁজেও পাচ্ছেন না, তারাও মাসিক ভাতার আওতায় থাকবেন।
রাজনৈতিক মহলের মতে, ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে যুব সমাজকে কাছে টানতেই এই পদক্ষেপ।
শিবিরে উপচে পড়া ভিড়, সকাল থেকেই লাইন
রবিবার সকাল সাড়ে ৮টা। হুগলির শ্রীরামপুরে দামি মোটরবাইক থেকে নেমে স্ত্রী ও চার মাসের শিশুকে নিয়ে এক যুবক দাঁড়িয়ে পড়লেন লাইনে—শিবির খুলতে তখনও দেড় ঘণ্টা বাকি।
বহরমপুর স্টেশনে কেরলফেরত এক পরিযায়ী শ্রমিক বাড়ি ফেরার আগেই নাম নথিভুক্ত করতে লাইনে দাঁড়ালেন। হলদিয়ায় চন্দননগর মাছ বাজারে কাজ করা ২৮ বছরের এক যুবক দিনের মজুরি ছেড়ে শিবিরে হাজির। তাঁর কথায়, “মাসে দেড় হাজার টাকা এলেই একদিনের রোজগার উঠে আসবে।”
কোচবিহার থেকে কাকদ্বীপ, বাঁদোয়ান থেকে বিনপুর—প্রতিটি জায়গাতেই ‘যুবসাথী’ শিবিরে চোখে পড়েছে বিশাল ভিড়। বিরোধীরা বলছে, এই দীর্ঘ লাইন রাজ্যের কর্মসংস্থানের করুণ চিত্র। অন্যদিকে শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেস মনে করছে, এটাই তাদের প্রতি মানুষের আস্থার প্রমাণ।
কারা আবেদন করতে পারবেন?
- মাধ্যমিক পাশ হতে হবে
- বয়স ২১ থেকে ৪০ বছরের মধ্যে
- বেকার হতে হবে
- অন্য কোনও সরকারি ভাতা পেলে আবেদন করা যাবে না
- তবে ঐক্যশ্রী, স্বামী বিবেকানন্দ বা কন্যাশ্রী (কন্যাশ্রী-৩ সহ) বৃত্তিপ্রাপ্ত পড়ুয়ারা আবেদন করতে পারবেন
- লক্ষ্মী ভাণ্ডার প্রকল্পের সুবিধাভোগীরা আবেদন করতে পারবেন না
বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, উচ্চশিক্ষার ছাত্রছাত্রীরাও এখন এই প্রকল্পের আওতায় আসছেন—যা আগে ছিল না।
আবেদন প্রক্রিয়া কী?
সরকারি ক্যাম্পে সরাসরি অথবা অনলাইনে আবেদন করা যাবে।
প্রয়োজনীয় নথি—
- মাধ্যমিকের মার্কশিট
- আধার কার্ড
- ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের বিবরণ
- জাতিগত শংসাপত্র (প্রযোজ্য ক্ষেত্রে)
- পারিবারিক তথ্য ও ঠিকানা
শিবিরে অতিরিক্ত ভিড়ের কারণে নির্ধারিত সময়ের আগেই অনলাইন পোর্টাল চালু করা হয়েছে।
বাজেট, ভাতা ও কার্যকরী তারিখ
রাজ্য বাজেটে এই প্রকল্পের জন্য ৫০০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। আগামী ১ এপ্রিল থেকে উপভোক্তাদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে টাকা জমা পড়া শুরু হবে। সর্বাধিক পাঁচ বছর পর্যন্ত এই ভাতা পাওয়া যাবে। তবে এই সময়ের মধ্যে চাকরি পেলে সুবিধা বন্ধ হয়ে যাবে।
প্রথমে ১৫ আগস্ট থেকে প্রকল্প শুরুর কথা ঘোষণা করা হলেও পরে মুখ্যমন্ত্রী জানান, ফেব্রুয়ারি থেকেই ক্যাম্প হবে এবং এপ্রিল থেকে টাকা দেওয়া শুরু হবে।
রাজনৈতিক তাৎপর্য কী?
২০২১ সালের নির্বাচনে লক্ষ্মী ভাণ্ডার প্রকল্প নারীদের সমর্থন জোগাড় করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিল। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এবার যুব ভোট—বিশেষত পুরুষ ভোটারদের—লক্ষ্য করেই ‘যুবসাথী’কে সামনে আনা হয়েছে।
১৫ বছরের শাসনের পর স্বাভাবিকভাবেই কিছুটা অ্যান্টি-ইনকাম্বেন্সির মুখে সরকার। সেই প্রেক্ষাপটে এই ভাতা প্রকল্পকে বড় নির্বাচনী অস্ত্র হিসেবে দেখছে রাজনৈতিক মহল। যদিও প্রকল্পটি নারী-পুরুষ উভয়ের জন্য, শুরুর দিনগুলিতে লাইনে পুরুষদের সংখ্যাই বেশি চোখে পড়েছে।
সব মিলিয়ে, ‘যুবসাথী’ এখন শুধু ভাতা প্রকল্প নয়—২০২৬-এর আগে বাংলার রাজনৈতিক অঙ্কে এক বড় সমীকরণ।











