প্রকৃতির আরাধনায় মেতেছে পশ্চিম বর্ধমান, তিন দিনের ‘বাহা বঙ্গা’ উৎসবের মহাসমাপন

single balaji

আসানসোল-সহ পশ্চিম বর্ধমান জেলার বিভিন্ন প্রান্তে আদিবাসী সমাজের অন্যতম প্রধান প্রকৃতিপূজার উৎসব ‘বাহা বঙ্গা’ তিন দিনব্যাপী আচার-অনুষ্ঠান ও সাংস্কৃতিক আয়োজনের মধ্য দিয়ে সমাপ্ত হয়েছে। ফাল্গুন মাসে পালিত এই উৎসব প্রতি বছরই আদিবাসী সমাজের কাছে বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। চলতি বছরে ১ মার্চ থেকে ৩ মার্চ ২০২৬ পর্যন্ত গভীর শ্রদ্ধা ও উৎসাহের সঙ্গে উৎসব পালিত হয়।

১ মার্চ (বাংলা ১৬ ফাল্গুন) ‘বাহা বঙ্গা মার্শাল চান্দু চাট কুনোমি’ উপলক্ষে গ্রাম পুরোহিতেরা জাহের থানে ‘জাহের সারিম দালব’ আচার সম্পন্ন করেন এবং জাহের দেবতাদের পবিত্র স্নান করান। এই আচার দিয়েই উৎসবের সূচনা হয়।

২ মার্চ (বাংলা ১৭ ফাল্গুন) ‘বাহা বঙ্গা মার্শাল চান্দু বুরু কুনোমি’ উপলক্ষে জাহের বঙ্গা, সারদি ও মহা বঙ্গাবুরু দেবতার পূজা হয়। একই সঙ্গে নবপল্লবিত শাল ও মহুয়া ফুলের আরাধনার মাধ্যমে নতুন বছরের আগমনকে স্বাগত জানানো হয়।

💃 জাহের থানে নৃত্য-গানে ভরল পরিবেশ

পূজার পর জাহের থানে দেবতাদের উদ্দেশ্যে ঐতিহ্যবাহী নৃত্য ও গানের আয়োজন করা হয়। গ্রামের নারী-পুরুষ ধর্মস্থল থেকে নৃত্য করতে করতে পুরোহিত, নাইকে বাবা ও কুড়ম নাইকে বাবাকে প্রতিটি বাড়িতে নিয়ে যান। প্রতিটি বাড়ির মহিলারা দরজায় পুরোহিতদের পা জল ও তেল দিয়ে পবিত্র করে প্রণাম জানান। এরপর শাল ফুল বিতরণ ও শালজল ছিটিয়ে আশীর্বাদ দেওয়া হয়।

৩ মার্চ (বাংলা ১৮ ফাল্গুন, পূর্ণিমা) ‘বাহা বঙ্গা মার্শাল চান্দু আত কুনোমি’ উপলক্ষে ‘বাহা বাস্কে’ আচার সম্পন্নের মাধ্যমে উৎসবের সমাপ্তি ঘটে।

🌸 বাহা দাঃ পালনে সম্প্রীতির বার্তা

উৎসবের প্রথম দিন থেকেই আসানসোলের বড়ডাঙা ও নিয়ামতপুর, রানিগঞ্জের বাঁসড়া ও রানিসায়র এবং দুর্গাপুরের বিভিন্ন আদিবাসী গ্রামে উৎসবমুখর পরিবেশ লক্ষ্য করা যায়। শেষ দিনে আসানসোলের হিরাপুর থানার অন্তর্গত হাড়াম-ডি গ্রামে ঐতিহ্যবাহী বাহা নৃত্য ও গানের মহা আয়োজন হয়। নারী-পুরুষ পাঁচি ধুতি ও পাঁচি শাড়ি পরে আনন্দে অংশ নেন। একে অপরের মাথায় শালফুলের জল ঢেলে ‘বাহা দাঃ’ প্রথা পালন করেন।

পশ্চিম বর্ধমান মাঝি মাপজি মাণ্ডওয়া ও আসানসোল মহকুমা মাণ্ডওয়ার মাঝি লক্ষীরাম মুর্মু জানান, আদিবাসী সমাজ প্রকৃতিপূজক এবং তাদের জীবন-জীবিকা সম্পূর্ণভাবে প্রকৃতির উপর নির্ভরশীল। প্রতিবছরের মতো এ বছরও প্রশাসনের সহযোগিতায় উৎসব সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে।

হাড়াম-ডি গ্রামের সেনাপতি মতিলাল সোরেন বলেন, জাহের থানে জাহের দেবতা ও শিশির জাড়ি দেবতার পূজার প্রথা বহু প্রাচীন। প্রথম দিনে জাহের দালব, দ্বিতীয় দিনে বিশেষ পূজা এবং শেষ দিনে বাহা বাস্কে আচার পালনের মাধ্যমে প্রকৃতি দেবতার আরাধনা করা হয়।

তিন দিনের এই উৎসব পশ্চিম বর্ধমান জেলায় আদিবাসী সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও প্রকৃতির প্রতি অটুট বিশ্বাসের এক জীবন্ত চিত্র তুলে ধরেছে। শাল ও মহুয়ার সুগন্ধ, ঢোল-মাদলের তালে তালে নৃত্য আর সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির আবহ—সব মিলিয়ে ‘বাহা বঙ্গা’ হয়ে উঠেছে প্রকৃতি ও সংস্কৃতির এক অনন্য মিলনমেলা।

ghanty

Leave a comment