আসানসোল:
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর বহুল প্রচারিত স্লোগান— “আমি নিজে দুর্নীতি করব না, কাউকেও করতে দেব না”— বাস্তবে কতটা কার্যকর, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে আসানসোল রেল ডিভিশনকে ঘিরে। মাত্র ছয় মাসের জন্য নিযুক্ত ডিভিশনাল রেলওয়ে ম্যানেজার (ডিআরএম) বিনীতা শ্রীবাস্তব–এর হঠাৎ বদলি ঘিরে এবার চাঞ্চল্যকর অভিযোগ সামনে এসেছে।
ডিআরএম বিনীতা শ্রীবাস্তব অভিযোগ করেছেন, জামুইয়ের তেলওয়া বাজারে ভয়াবহ ট্রেন দুর্ঘটনার পর তাঁকে পরিকল্পিতভাবে “বলির পাঁঠা” বানানো হয়েছে। এই ষড়যন্ত্রে পূর্ব রেলের একাংশ শীর্ষ আধিকারিক জড়িত বলে তাঁর দাবি। দুর্ঘটনার পর দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে টানা প্রায় ৭৫ ঘণ্টা উদ্ধার ও রেল চলাচল পুনরুদ্ধারের কাজ তদারকি করার জন্য একাংশ রেল আধিকারিক তাঁর কাজের প্রশংসাও করেছিলেন।
তবুও আচমকাই তাঁকে আসানসোল ডিভিশন থেকে সরিয়ে ওয়েস্ট সেন্ট্রাল রেলওয়ে–তে বদলি করা হয়। অভিযোগ তোলা হয়, ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক করতে দেরি হয়েছে তাঁর কারণে। এই সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে তিনি কলকাতা সেন্ট্রাল অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ ট্রাইবুনাল (CAT)–এর দ্বারস্থ হন।

CAT–এ চ্যালেঞ্জ, স্ট্যাটাস কো বজায় রাখার নির্দেশ
ডিআরএম বিনীতা শ্রীবাস্তব এখনো নতুন ডিআরএম হিসেবে নিযুক্ত সুধীর কুমার শর্মা–র কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর করেননি। তাঁর আইনজীবীর দাবি, কোনও প্রশাসনিক প্রয়োজন ছাড়াই তাঁকে বদলি করা হয়েছে এবং তাঁকে লিখিত বদলি নির্দেশও দেওয়া হয়নি। অনানুষ্ঠানিকভাবে বিষয়টি জানানো হয়।
CAT–এ শুনানির পর ট্রাইবুনাল রেল কর্তৃপক্ষের কাছে প্রশ্ন তোলে—
একই দিনে বদলি ও দায়িত্ব হস্তান্তরের কী প্রশাসনিক যুক্তি রয়েছে?
আদালত রেল কর্তৃপক্ষকে জবাব দিতে নির্দেশ দিয়েছে এবং ৮ জানুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত স্ট্যাটাস কো বজায় রাখার পাশাপাশি আবেদনকারীর বিরুদ্ধে কোনও শাস্তিমূলক পদক্ষেপ না নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে।
দুর্ঘটনার দায় কার? নথি বলছে ভিন্ন কথা
রেলের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, ৩০ ডিসেম্বর রাত ৮টায় জমা দেওয়া ২.২২ কোটি টাকার ক্যাশ ইমপ্রেস্ট প্রস্তাবে ডিআরএম সম্মতি না দেওয়ায় দেরি হয়েছে। কিন্তু MSOP পার্ট-সি, প্যারা ১০(E) অনুযায়ী দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে ব্যয় সংক্রান্ত পূর্ণ ক্ষমতা JAG/SG স্তরের আধিকারিকদের হাতে থাকে। ডিআরএম–এর অনুমোদন সেখানে বাধ্যতামূলক নয়।
তথ্য অনুযায়ী—
- ডিআরএম ২৮ ডিসেম্বর রাত ১২টা ১৪ মিনিটে দুর্ঘটনাস্থলে পৌঁছান
- টানা ৭৫ ঘণ্টা সেখানে উপস্থিত ছিলেন
- ৩০ ডিসেম্বর রাত ১২টা ১০ মিনিটে ডাউন মেইন লাইন চলাচলের উপযোগী হয়
- তবুও সিনিয়র অফিসারদের সিদ্ধান্তে ১৯ ঘণ্টার বেশি সময় সিঙ্গল লাইন চালু করা হয়নি
- দেরির মূল কারণ ছিল রোড ক্রেন ও কাউন্টার ওয়েট দেরিতে পৌঁছানো
এই প্রেক্ষিতে ডিআরএম–কে দায়ী করা MSOP–এর পরিপন্থী বলেই মনে করছেন রেল মহলের একাংশ।
RLDA জমি হস্তান্তর ঘিরে নতুন রহস্য
আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে। অক্টোবর ২০২৫–এ ডিআরএম বিনীতা শ্রীবাস্তব পূর্ব রেল হেডকোয়ার্টারে চিঠি দিয়ে আসানসোল ডিভিশনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ও মূল্যবান জমি RLDA–কে হস্তান্তর নিয়ে তদন্ত চেয়েছিলেন। অভিযোগ, এই জমি হস্তান্তরের পেছনে ভূমি মাফিয়াদের চাপ ছিল, যা তিনি প্রশ্ন করেছিলেন।
অনেকের মতে, এই জমি–সংক্রান্ত প্রশ্ন তোলাই তাঁর বদলির অন্যতম কারণ।
প্রাকৃতিক ন্যায়বিচার লঙ্ঘনের অভিযোগ
ডিআরএম–কে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়েই বদলি করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। CAT–এ জমা পড়া ছয় পৃষ্ঠার নথি এখন সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল। যদিও Bengal Mirror এই নথিগুলির সত্যতা নিশ্চিত করেনি।
সব মিলিয়ে ৮ জানুয়ারি ২০২৬–এর শুনানির দিকেই তাকিয়ে রেল প্রশাসন ও সাধারণ মানুষ। রেল কর্তৃপক্ষ এখনও পর্যন্ত কোনও আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেয়নি।











