আসানসোল:
পশ্চিম বর্ধমান জেলার আসানসোল উত্তর বিধানসভা কেন্দ্র একসময় বামফ্রন্টের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত ছিল। কিন্তু রাজনৈতিক সমীকরণ বদলের সঙ্গে সঙ্গে গত টানা তিনটি বিধানসভা নির্বাচনে এই কেন্দ্র দখলে রেখেছে তৃণমূল কংগ্রেস। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনেও এই আসনকে দলের অন্যতম সবচেয়ে নিরাপদ আসন হিসেবে বিবেচনা করছে তৃণমূল।
এর প্রধান কারণ রাজ্যের প্রভাবশালী নেতা ও মন্ত্রিসভার সদস্য মলয় ঘটক। দলীয় অন্দরে তিনি পরিচিত ‘ট্রাবলশুটার’ হিসেবে। পশ্চিম বর্ধমান কিংবা আসানসোল–দুর্গাপুর শিল্পাঞ্চলে সংগঠনগত সমস্যা হোক বা অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব—সব ক্ষেত্রেই মালয় ঘটকের ভূমিকা নির্ণায়ক বলে মনে করা হয়।
তার সহজ জীবনযাপন, কর্মীদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ এবং শ্রমিক মহলের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক তাকে এলাকার অন্যতম জনপ্রিয় নেতায় পরিণত করেছে।
🏛️ আসানসোল উত্তর: বদলে যাওয়া রাজনৈতিক সমীকরণ
বিধানসভার সরকারি নথি অনুযায়ী, ১৯৫১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত আসানসোল কেন্দ্র ছিল বামেদের দখলে। এই সময়ে ১৪টি নির্বাচনের মধ্যে ৯টিতে জয় পায় বাম দলগুলি, কংগ্রেস জেতে ৪ বার।
তৃণমূল কংগ্রেস প্রথম জয় পায় ২০০১ সালে।

২০১১ সালে বিধানসভা কেন্দ্রের পুনর্বিন্যাসের পর আসানসোল উত্তর আলাদা কেন্দ্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। সেই সময় থেকেই এই আসনে তৃণমূলের আধিপত্য।
২০১১, ২০১৬ ও ২০২১—টানা তিনবার জয়ী হন মালয় ঘটক।
🗳️ টানা জয়ের নজির
- ২০১১: সিপিএম প্রার্থী রাণু রায়চৌধুরীকে ৪৭,৭৯৩ ভোটে হারান
- ২০১৬: বিজেপির নির্মল কর্মকারকে হারান ২৩,৮৯৭ ভোটে
- ২০২১: বিজেপির কৃষ্ণেন্দু মুখার্জিকে হারান ২১,১১০ ভোটে
এই পরিসংখ্যান স্পষ্ট করে দেয়, বিরোধীদের কাছে আসানসোল উত্তর এখনও কঠিন চ্যালেঞ্জ।
👤 ২০০১ থেকে রাজনৈতিক যাত্রা
মলয় ঘটকের রাজনৈতিক জীবন কয়েক দশক দীর্ঘ। শুরু থেকেই তিনি শ্রমিক আন্দোলন ও স্থানীয় জনসমস্যার সঙ্গে যুক্ত।
২০০১ সালে প্রথম বিধায়ক নির্বাচিত হন।
২০০৬ সালে পরাজয়ের পর ২০১১ সালে ঐতিহাসিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর তিনি দুর্দান্ত প্রত্যাবর্তন করেন এবং তারপর থেকে একটানা জিতে চলেছেন।

🏛️ মমতা সরকারের অন্যতম স্তম্ভ
২০১১ সালে তৃণমূল সরকার গঠনের পর থেকে মলয় ঘটক প্রতিটি মন্ত্রিসভায় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে রয়েছেন।
তিনি সামলেছেন—
- শ্রম দপ্তর
- কৃষি বিপণন দপ্তর
- বর্তমানে আইন ও বিচার বিভাগ এবং শ্রম দপ্তর
আইন ও শ্রম সংক্রান্ত বিষয়ে তাঁর গভীর জ্ঞানের জন্য তিনি মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সবচেয়ে বিশ্বস্ত সহকর্মীদের একজন হিসেবে পরিচিত।
🎓 শিক্ষা ও পেশাগত জীবন
আসানসোলে জন্ম মলয় ঘটকের।
তিনি—
- বিজ্ঞানে স্নাতক (B.Sc.)
- কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন ডিগ্রি (LL.B.)
অর্জন করেন।
রাজনীতিতে আসার আগে তিনি আসানসোল আদালতের একজন খ্যাতনামা আইনজীবী ছিলেন। এই আইনি অভিজ্ঞতা তাঁর প্রশাসনিক কাজেও বড় ভূমিকা রেখেছে।
⚔️ বিজেপি ও বিরোধীদের চ্যালেঞ্জ
২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি প্রার্থীর অল্প ব্যবধানে পরাজয়ের পর গেরুয়া শিবির কিছুটা আত্মবিশ্বাস পেয়েছে।
বিজেপির কৌশল—
- হিন্দিভাষী ভোটার
- তফসিলি জাতি ও উপজাতি ভোটব্যাঙ্কে প্রবেশ
অন্যদিকে তৃণমূল শিবির আশঙ্কা করছে, বাম–কংগ্রেস জোট ফের সক্রিয় হলে লড়াই আরও কঠিন হতে পারে।
🔍 সারসংক্ষেপ
সব রাজনৈতিক সমীকরণ মিলিয়ে দেখা গেলে,
আসানসোল উত্তরে মলয় ঘটক এখনও তৃণমূলের সবচেয়ে বড় শক্তি।
২০২৬ সালে লড়াই কঠিন হলেও বর্তমান পরিস্থিতিতে তাঁকে হারানো বিরোধীদের কাছে মোটেও সহজ নয়।











