আসানসোল (প্রেম শঙ্কর চৌবে)।
গত তিন থেকে চার দশক ধরে আসানসোল–দুর্গাপুর শিল্পাঞ্চল, যার ঐতিহ্য আর ইতিহাস দুই-ই সমৃদ্ধ, এখন পরিণত হয়েছে চোরাচালানকারীদের স্বর্গে। শুধুমাত্র মাফিয়া বা দালাল নয়, বরং প্রভাবশালী সাদা কলারের মানুষজনও এই অঞ্চলের প্রাকৃতিক সম্পদকে কালো টাকার খনিতে রূপান্তরিত করেছেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শুধু মুখ বদলেছে, বদলেছে চোরাচালানের কৌশলও। নতুন নতুন মুখ সামনে এলেও পর্দার আড়ালে থাকা শক্তি রয়ে গেছে অদৃশ্যই।
এই বিশেষ ধারাবাহিকের দ্বিতীয় পর্বে প্রশ্ন—সিন্ডিকেট কী? কারা এর মাথা? কারাই বা সদস্য?
‘সিন্ডিকেট’ শব্দ নিজেই বলে দেয়—এ এক সংগঠিত গ্যাং। গোপনে অপরাধ চালানোর দল। কিন্তু শিল্পাঞ্চলের সিন্ডিকেটের বিশেষত্ব হল—এখানে কিছুই গোপনে হয় না। একদল বলে—“কেউ কিছু জানে না।”
অন্যদল বলে—“সবাই সব জানে, কিন্তু কেউ বলে না!”
🔻 শিল্পাঞ্চলে সিন্ডিকেটের কাঠামো
কয়লা–বালির চোরাচালানকে নিয়মতান্ত্রিকভাবে চালানোর জন্য এক বড়সড় সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। প্যাড থেকে দালাল, তোলাবাজ থেকে স্মাগলার—সবাই এর অংশ। প্রতিটি থানার এলাকার দায়িত্ব ভাগ করে দেওয়া হয়েছে আলাদাভাবে।
কয়লা চোরাচালান একসময় আঘাত পেয়েছিল Anup Maji ওরফে লালা গ্রেফতার হওয়ার পর। এরপর পালিয়ে যায় মাস্টারমাইন্ড বিনয় মিশ্র। CBI ও ED-র কড়া তদন্তে সাময়িক থমকে যায় সিন্ডিকেট।
কিন্তু ২০২৩ সালের অক্টোবরেই নতুন সিন্ডিকেট জন্ম নেয়—২০২৪ সালের নভেম্বর পর্যন্ত চলে মসৃণ ব্যবসা। পরে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কঠোর অবস্থানের পর বদলি হয় একাধিক পুলিশ অফিসার, সরানো হয় CID প্রধানকেও। এতে কার্যত সিন্ডিকেট কিছুদিন কোমায় চলে যায়।

কিন্তু ৩–৪ মাস পর ফের সক্রিয় হয়ে ওঠে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরেই এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে নতুন সিন্ডিকেট তৈরি হয়—পুরনোদের বাদ দিয়ে নতুন মুখদের সামনে আনা হয়।
🔻 নতুন সিন্ডিকেটে কারা কারা
এই মুহূর্তে তিনটি প্রধান নাম—
লোকেশ, পাপ্পু, আর নতুন মুখ শশী।
শশী আগে কয়লা ব্যবসায় যুক্ত ছিল। দক্ষতা দেখে সিন্ডিকেট তাকে সামনে আনে। কুলটি–বারাকর–ঝনকপুরা অঞ্চলে তার দাপট ইতিমধ্যেই নজর কেড়েছে।
সদস্যদের দাবি—লোকেশই শিল্পাঞ্চলের সিন্ডিকেটে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করে। পাপ্পু হল তার ডানহাত। কিন্তু লোকেশও নাকি ‘অন্য কারও’ নির্দেশে চলে—সব সিদ্ধান্ত সে নিজে নেয় না।
🔻 সিন্ডিকেটের রুট ও কালোবাজার
শিল্পাঞ্চল থেকে চোরাই কয়লা ও বালি বোঝাই গাড়ি হাইওয়ে ধরে নিরাপত্তার মধ্যেই পৌঁছে যায় ডানকুনি–ডানলপ।
সেখানেই তৈরি হয় “অরিজিনাল কাগজ”—তারপর পণ্য পৌঁছয় উত্তর-পূর্ব ভারত, ওড়িশা এবং বাংলাদেশে।
কলকাতায় (ডানকুনি) পুরো অপারেশন সামলায় কেকে (KK)—কিন্তু তিনিও উচ্চতর কারও নির্দেশে কাজ করেন।
🔻 কোন অঞ্চলের দায়িত্ব কার?
🔹 দুর্গাপুর–আন্ডাল–পান্ডেশ্বর: লোকেশ
🔹 কুলটি–বারাকর: শশী
🔹 বারাবনী–সালানপুর: সঞ্জয়
🔹 জামুড়িয়া: সোদু, অলোক, গোষ্ঠো
🔹 রানীগঞ্জ: পাপ্পু, কৃষ্ণ, লাটুয়া, কায়াল
🔹 আসানসোল: বিবেক, ঝান্টু, অভিনাশ
🔹 কলকাতা (ডানকুনি): কেকে
শিল্পাঞ্চলের সিন্ডিকেটে নতুন সদস্যরাই বেশি। এরাই গত ৭–৮ বছর ধরে সক্রিয়। পুরনোদের মধ্যে লোকেশ, পাপ্পু, কৃষ্ণ, কায়াল আজও গুরুত্বপূর্ণ। গোষ্ঠো, লাটুয়া, সোদু বহুদিনের কয়লা কারবারি। আর বিবেক ও ঝন্টু বালির কারবারের পুরনো খেলোয়াড়।
প্রত্যেক থানার সিন্ডিকেট সদস্যদের নিচে থাকে ডজন ডজন লোক আর শতাধিক হাত—যারা প্রয়োজনে সব রকম ‘ব্যবস্থা’ করে দেয়। বড় মাথারা সামনে আসে না—সামনের সারিতে থাকে গরিব-দুঃখী সদস্যরা।
🔻 শিল্পাঞ্চলের সিন্ডিকেটের ভবিষ্যৎ রহস্য
সিন্ডিকেট এখন কয়লা–বালি–স্টোন ডাস্ট–প্যাড–তোলাবাজি—সব মিলিয়ে হাজার কোটি টাকার অবৈধ ব্যবসা চালায়।
সবাই জানে এদের পেছনে কারা আছে, কিন্তু নাম কেউ বলে না।
এর আসল ‘মাথা’ কারা—তা হয়তো পরবর্তী পর্বেই প্রকাশ্যে আসতে পারে।
🔜 পার্ট–৩ এ পড়ুন:
সিন্ডিকেটের জন্ম কবে? কীভাবে তৈরি হল এই অন্ধকার সাম্রাজ্য?











