আসানসোল:
আসানসোল-বারাবনি বিধানসভা কেন্দ্রের গোরাণ্ডি–কাসকুলি এলাকা বর্তমানে ভয়াবহ পরিবেশগত সংকটের মুখে। এলাকাজুড়ে বেআইনি পাথর খাদান ও ক্রাশার মেশিনের দৌরাত্ম্য থামার কোনও লক্ষণ নেই। পরিস্থিতি এতটাই ভয়ংকর হয়ে উঠছে যে স্থানীয়দের মুখে মুখে গোরাণ্ডিকে এখন ‘আরেকটি পাচামি’ বলে আখ্যা দেওয়া হচ্ছে।
সরকারি দপ্তরগুলির কথিত নিষ্ক্রিয়তার সুযোগ নিয়ে পাথর মাফিয়ারা প্রকাশ্যেই বেআইনি খনন চালাচ্ছে। এর ফলে প্রতিদিন কোটি কোটি টাকার সরকারি রাজস্ব ক্ষতি হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
🌳 আদিবাসী সমাজের সংগঠিত প্রতিবাদ
এই বেআইনি কার্যকলাপের বিরুদ্ধে এবার সংগঠিতভাবে পথে নেমেছে আদিবাসী সমাজ। ভারত জাকাত মাঝি পরগনা মহল-এর ব্যানারে আদিবাসীরা পশ্চিম বর্ধমানের জেলাশাসকের কাছে স্মারকলিপি জমা দিয়ে অবিলম্বে বেআইনি খাদান ও ক্রাশার মেশিন বন্ধের দাবি জানিয়েছেন।
আদিবাসী সমাজের অভিযোগ, গোরাণ্ডি এলাকায় কোনও বৈধ অনুমতি ছাড়াই পাথর খাদান ও ক্রাশার চালানো হচ্ছে। এর জন্য ব্যাপক হারে জঙ্গল কেটে ফেলা হয়েছে, ধ্বংস করা হয়েছে হাজার হাজার গাছপালা। স্থানীয় মানুষদের সামান্য টাকার লোভ দেখিয়ে এই বেআইনি খননে যুক্ত করা হচ্ছে।
💥 জঙ্গলে লুকোনো বিস্ফোরক, আতঙ্কে এলাকা
স্মারকলিপিতে জানানো হয়েছে, এই খাদান ও ক্রাশারগুলির কাছে দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদের অনুমতি নেই, এমনকি রাজ্য বা কেন্দ্র সরকারের বৈধ খনন ছাড়পত্রও নেই। তা সত্ত্বেও বিস্ফোরক ব্যবহার করে জোরালো বিস্ফোরণের মাধ্যমে পাথর ভাঙা হচ্ছে।
অভিযোগ, জঙ্গলের বিভিন্ন অংশে বিপুল পরিমাণ বিস্ফোরক লুকিয়ে রাখা হচ্ছে। এই বিস্ফোরণের জেরে গোটা এলাকা কেঁপে উঠছে এবং পাশের বাড়িগুলির দেওয়ালে ফাটল ধরছে, যা চরম নিরাপত্তাহীনতার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
🗣️ “জল-জঙ্গল-জমি রক্ষাই আমাদের পরিচয়”—স্বপন মুর্মু
ভারত জাকাত মাঝি পরগনা মহলের সদস্য স্বপন মুর্মু বলেন, আদিবাসী সমাজ যুগ যুগ ধরে জল, জঙ্গল ও জমি রক্ষা করে এসেছে। জঙ্গল তাদের কাছে দেবতুল্য, সবুজই তাদের জীবন। তাই যদি বেআইনি ভাবে জঙ্গল ধ্বংস করা হয়, তবে আদিবাসী সমাজ নিজেদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য রক্ষায় শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত লড়াই করবে।
🌫️ ধুলো-দূষণে অতিষ্ঠ সাধারণ মানুষ
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, ক্রাশার মেশিন থেকে উড়ে আসা ধুলো ও দূষণে গোটা এলাকায় বসবাস কার্যত অসম্ভব হয়ে উঠেছে। বাতাসে ভেসে থাকা ধুলো বাড়ির ছাদ, জামাকাপড় ও খাবারদাবার নষ্ট করছে। শিশু ও বয়স্কদের স্বাস্থ্যের ওপর এর মারাত্মক প্রভাব পড়ছে।
📜 আইন কঠোর, বাস্তবে মানা হচ্ছে না
বিশেষজ্ঞদের মতে, আগে ডিসিআর ব্যবস্থা অনুযায়ী খনি মালিকরা মাসে প্রায় ৮০ হাজার টাকা ফি দিয়ে খনন চালাতেন। তখনও বিস্ফোরক ও দূষণ সংক্রান্ত নিয়ম লঙ্ঘনের অভিযোগ ছিল। এই কারণেই ২০১৬ সালে রাজ্য সরকার নতুন খনন নীতি চালু করে।
নতুন নিয়ম অনুযায়ী—
- সরকারি জমির পাথর সরকার নিজেই নিলাম করে,
- ব্যক্তিগত জমিতে খননের জন্য সাড়ে সাত বিঘা জমি ও পাঁচ বছরের অনুমতি প্রয়োজন,
- পাশাপাশি জিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া, দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদ ও বন দপ্তর থেকে ছাড়পত্র বাধ্যতামূলক।
অভিযোগ, গোরাণ্ডি এলাকায় খননকারীরা কেবল জমি সংক্রান্ত কিছু নথি জমা দিয়ে অনুমতি আদায় করেছে, কিন্তু অন্য প্রয়োজনীয় দপ্তরের অনুমোদন নেয়নি। তবুও প্রতিদিন কোটি কোটি টাকার পাথর উত্তোলন করে সরকারি কোষাগারে বিরাট ক্ষতি করা হচ্ছে।
❗ সবচেয়ে বড় প্রশ্ন: বিস্ফোরক কার আশ্রয়ে?
সবচেয়ে উদ্বেগজনক প্রশ্ন উঠছে—জঙ্গলে মজুত বিপুল পরিমাণ বিস্ফোরক কার নিরাপত্তায় রয়েছে? যদি এগুলি ভুল হাতে পড়ে, তাহলে ভবিষ্যতে আসানসোলের নিরাপত্তা বড়সড় বিপদের মুখে পড়তে পারে।
এখন সকলের নজর জেলা প্রশাসনের দিকে—এই গুরুতর বিষয় নিয়ে তারা কবে এবং কী কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করে।











