কলকাতা/মধ্যমগ্রাম: পশ্চিমবঙ্গে ভোট-পরবর্তী হিংসার আবহের মধ্যেই বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারী-র ব্যক্তিগত সহকারী চন্দ্রনাথ রথ খুনের ঘটনায় একের পর এক চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে আসছে। উত্তর ২৪ পরগনার মধ্যমগ্রামে ঘটে যাওয়া এই শুটআউট কাণ্ডে তদন্ত যত এগোচ্ছে, ততই স্পষ্ট হচ্ছে এটি ছিল অত্যন্ত পরিকল্পিত ও টার্গেট করে চালানো হামলা।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, হামলাকারীরা সম্পূর্ণ প্রস্তুতি নিয়ে এসেছিল এবং গোটা অপারেশনে ব্যবহার করা হয়েছিল ভুয়ো নম্বর প্লেট লাগানো গাড়ি ও বাইক। ইতিমধ্যেই একটি সন্দেহভাজন গাড়ি বাজেয়াপ্ত করেছে পুলিশ, যা থেকে তদন্তে নতুন দিশা মিলেছে।
🚨 পুলিশের হাতে সন্দেহজনক গাড়ি, নম্বর প্লেট ভুয়ো
তদন্ত চলাকালীন পুলিশ একটি চারচাকা গাড়ি উদ্ধার করে, যার নম্বর ছিল শিলিগুড়ির। কিন্তু খতিয়ে দেখে পুলিশ জানতে পারে, গাড়ির নম্বর প্লেটটি সম্পূর্ণ ভুয়ো এবং তা ইচ্ছাকৃতভাবে বদলানো হয়েছিল হামলাকারীদের পরিচয় গোপন রাখতে।
ঘटनাস্থল থেকে উদ্ধার হয়েছে একাধিক গুলির খোসা, জীবন্ত কার্তুজ এবং গুরুত্বপূর্ণ ফরেন্সিক নমুনা। তদন্তকারীরা এখন সেই গাড়ির সূত্র ধরে অভিযুক্তদের খোঁজে নেমেছেন।
🔥 দীর্ঘক্ষণ ধাওয়া, তারপর আচমকা হামলা
পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে, হামলাকারীরা অনেকক্ষণ ধরেই চন্দ্রনাথ রথ-এর গাড়ির পিছু নিয়েছিল। মধ্যমগ্রামের দোহারিয়া-যশোর রোড এলাকায় গাড়ির গতি কমতেই পথ আটকে শুরু হয় গুলিবর্ষণ।
প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি—
- প্রথমে গাড়ির উইন্ডশিল্ড লক্ষ্য করে গুলি চালানো হয়
- এরপর সামনের সিটে বসে থাকা চন্দ্রনাথ রথকে টার্গেট করা হয়
- একের পর এক গুলিতে ঝাঁঝরা হয়ে যায় গাড়ি
গুরুতর জখম অবস্থায় তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলেও চিকিৎসকেরা মৃত ঘোষণা করেন। হামলায় তাঁর নিরাপত্তারক্ষী বুদ্ধদেব এবং গাড়িচালকও আহত হন।
🏍️ বাইক ও গাড়ি—দুই মাধ্যমেই হামলা
তদন্তে আরও জানা গেছে, হামলায় একটি গাড়ি এবং বাইক বাহিনী—দুই-ই ব্যবহার করা হয়েছিল।
👉 প্রথমে একটি গাড়ি লক্ষ্যবস্তু গাড়িকে আটকে দেয়
👉 তারপর বাইকে করে আসে দুষ্কৃতীরা
👉 মুহূর্তের মধ্যে চলে এলোপাথাড়ি গুলি
👉 ঘটনার পর দ্রুত এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যায় হামলাকারীরা
পুলিশের অনুমান, ব্যবহৃত সমস্ত যানবাহনেই নকল নম্বর প্লেট লাগানো ছিল।
🕵️♂️ পরিকল্পিত খুনের তত্ত্বে জোর
তদন্তকারী সংস্থার মতে, এই হামলা ছিল অত্যন্ত পেশাদার এবং পূর্বপরিকল্পিত।
পুলিশের ধারণা—
- আগেই এলাকায় রেকি করা হয়েছিল
- পালানোর রুট আগে থেকেই ঠিক ছিল
- হামলাকারীরা অত্যন্ত নিখুঁতভাবে টার্গেট নির্বাচন করেছিল
ফলে এটি শুধুমাত্র সাধারণ হামলা নয়, বরং বড় রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের অংশ কিনা তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
⚡ বিজেপির অভিযোগ—“টার্গেটেড কিলিং”
শুভেন্দু অধিকারী এই ঘটনাকে “পরিকল্পিত রাজনৈতিক খুন” বলে দাবি করেছেন। তাঁর অভিযোগ, কয়েকদিন ধরেই নজরদারি চালানো হচ্ছিল এবং সম্পূর্ণ পরিকল্পনা করেই এই হামলা চালানো হয়েছে।
বিজেপির পক্ষ থেকে অবিলম্বে দোষীদের গ্রেফতার এবং কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার তদন্তের দাবি তোলা হয়েছে।
👤 কে ছিলেন চন্দ্রনাথ রথ?
চন্দ্রনাথ রথ ছিলেন শুভেন্দু অধিকারীর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সহযোগী ও ব্যক্তিগত সহকারী। তিনি একসময় ভারতীয় বায়ুসেনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বলে জানা গেছে। পরে সক্রিয় রাজনীতিতে যোগ দেন এবং বিভিন্ন নির্বাচনী প্রচারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
ভবানীপুর নির্বাচনের সময়ও তাঁকে অত্যন্ত সক্রিয়ভাবে দেখা গিয়েছিল।
🏥 হাসপাতালের বাইরে সমর্থকদের ভিড়
খবর ছড়িয়ে পড়তেই হাসপাতালে ভিড় জমায় বিজেপি সমর্থকরা। “দোষীদের শাস্তি চাই” স্লোগানে উত্তাল হয়ে ওঠে এলাকা।
পরিস্থিতি সামাল দিতে মোতায়েন করা হয় বিশাল পুলিশ বাহিনী। পরে হাসপাতালে পৌঁছে মৃতের পরিবারের সঙ্গে দেখা করেন শুভেন্দু অধিকারী।
📹 CCTV ও প্রযুক্তিগত তদন্তে জোর
পুলিশ এখন—
- CCTV ফুটেজ
- কল ডিটেল রেকর্ড (CDR)
- মোবাইল লোকেশন
- ফরেন্সিক তথ্য
খতিয়ে দেখে অভিযুক্তদের শনাক্ত করার চেষ্টা করছে।
তদন্তকারীরা এটাও জানার চেষ্টা করছেন, এই হত্যাকাণ্ড শুধুই ব্যক্তিগত টার্গেট ছিল, নাকি এর পিছনে আরও বড় কোনও রাজনৈতিক চক্রান্ত লুকিয়ে রয়েছে।
⚠️ উত্তপ্ত বঙ্গ রাজনীতি
এই ঘটনাকে ঘিরে ইতিমধ্যেই উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক মহল। বিজেপি যেখানে সরাসরি তৃণমূল কংগ্রেস-এর বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছে, সেখানে তৃণমূলও ঘটনার নিন্দা করে আদালতের তত্ত্বাবধানে CBI তদন্তের দাবি জানিয়েছে।
ভোট-পরবর্তী অশান্তির আবহে এই হাইপ্রোফাইল খুন এখন গোটা রাজ্যের রাজনৈতিক অঙ্গনে বড় ইস্যু হয়ে উঠেছে।















